কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন (ঢাকা) – সুযোগ-সুবিধা, প্ল্যাটফর্ম ও ভ্রমণ গাইড ২০২৬
বাংলাদেশের রেল যোগাযোগের প্রধান হৃৎপিণ্ড ও সর্ববৃহৎ কেন্দ্রীয় রেলওয়ে টার্মিনাস হলো রাজধানী ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন (অফিসিয়াল নাম: ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন)। প্রতিদিন এই ঐতিহাসিক স্টেশনটি থেকে পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলীয় রেল নেটওয়ার্কের আওতায় দেশের প্রতিটি বিভাগীয় ও জেলা সদরে অর্ধশতাধিক আন্তঃনগর, মেইল ও কমিউটার ট্রেন ছেড়ে যায় এবং লাখো যাত্রী যাতায়াত করেন। ১৯৬৮ সালে উদ্বোধন হওয়া এই স্টেশনটির অনন্য ছাতাসদৃশ প্যারাবোলয়েড কংক্রিট স্থাপত্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এক দৃষ্টিনন্দন নিদর্শন। আপনি যদি কমলাপুর স্টেশন থেকে ট্রেন ভ্রমণের প্রস্তুতি নেন, তবে যাত্রার পূর্বেই ২০২৬ সালের সর্বশেষ কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন প্ল্যাটফর্ম বিন্যাস, টিকিট কাউন্টার, স্মার্ট গেট ভেরিফিকেশন, লাগেজ ক্লকরুম, পার্কিং সুবিধা ও জরুরি যোগাযোগ নম্বরগুলো জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
⚡ এক নজরে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন (ঢাকা)
- স্টেশনের পূর্ণ নাম: ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন (জনপ্রিয় নাম: কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন)
- স্টেশন কোড: DA (Dhaka)
- মোট প্ল্যাটফর্ম সংখ্যা: ৮টি সক্রিয় যাত্রীবাহী প্ল্যাটফর্ম ও একাধিক ইয়ার্ড ট্র্যাক
- অবস্থান: মতিঝিল ও কমলাপুর বাণিজ্যিক এলাকার সন্নিকটে, ঢাকা
- কানেক্টিভিটি: ঢাকা মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন-৬ মতিঝিল/কমলাপুর সংযোগ), বাস ও রাইডশেয়ারিং
- প্রধান সুযোগ-সুবিধা: স্মার্ট টিকিট গেট, এসি ভিআইপি লাউঞ্জ, লাগেজ ক্লকরুম, সার্বক্ষণিক এটিএম ও ফুডকোর্ট

প্ল্যাটফর্ম বিন্যাস ও ট্রেন ছাড়ার বিস্তারিত নির্দেশিকা
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে মোট ৮টি সুপ্রশস্ত যাত্রীবাহী প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। প্ল্যাটফর্মগুলোর সুনির্দিষ্ট ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা থাকলে শেষ মুহূর্তে যাত্রীদের ছোটাছুটি করতে হয় না:
| প্ল্যাটফর্ম নম্বর | প্রধান নির্ধারিত রুট ও ট্রেনের ধরন | গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনসমূহ |
|---|---|---|
| প্ল্যাটফর্ম ১ ও ২ | চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার রুটের প্রধান আন্তঃনগর ট্রেন | সুবর্ণ এক্সপ্রেস, সোনার বাংলা এক্সপ্রেস, তূর্ণা এক্সপ্রেস, কক্সবাজার এক্সপ্রেস |
| প্ল্যাটফর্ম ৩ ও ৪ | সিলেট ও ময়মনসিংহ রুটের আন্তঃনগর ট্রেন | পারাবত এক্সপ্রেস, জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস, তিস্তা এক্সপ্রেস, ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস |
| প্ল্যাটফর্ম ৫ ও ৬ | রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলের পশ্চিমাঞ্চলীয় ব্রডগেজ ট্রেন | বনলতা এক্সপ্রেস, সিল্কসিটি এক্সপ্রেস, পদ্মা এক্সপ্রেস, রংপুর এক্সপ্রেস |
| প্ল্যাটফর্ম ৭ ও ৮ | উত্তরবঙ্গ (পঞ্চগড়) ও দক্ষিণবঙ্গ (খুলনা-বেনাপোল) রুট | একতা এক্সপ্রেস, দ্রুতযান এক্সপ্রেস, সুন্দরবন এক্সপ্রেস, বেনাপোল এক্সপ্রেস |
স্মার্ট গেট, এনআইডি স্ক্যানার ও টিকিট চেকিং ব্যবস্থা
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে বর্তমানে শতভাগ ডিজিটাল নিরাপত্তা ও টিকিট ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। স্টেশনের প্রধান প্রবেশমুখে আধুনিক স্মার্ট ব্যারিয়ার গেট স্থাপন করা হয়েছে। যাত্রীদের এনআইডি কার্ড বা অনলাইন ই-টিকিটের কিউআর কোড (QR Code) স্ক্যান করলেই কেবল প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের অনুমতি মেলে। বিনা টিকিটের যাত্রীদের প্রবেশ ঠেকাতে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) সার্বক্ষণিক নজরদারি বজায় রাখে। এছাড়া তাৎক্ষণিক আসন ও ট্রেন ছাড়ার প্ল্যাটফর্ম নম্বর জানার জন্য বিশাল ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড সার্বক্ষণিক চালু থাকে।
যাত্রী বিশ্রামাগার, ভিআইপি লাউঞ্জ ও বিশেষ সেবা
দীর্ঘযাত্রার পূর্বে যাত্রীদের আরামদায়ক অপেক্ষার জন্য কমলাপুর স্টেশনে একাধিক আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে:
- প্রথম শ্রেণি ও এসি যাত্রীদের ওয়েটিং লাউঞ্জ: স্নিগ্ধা ও এসি টিকিটধারীদের জন্য সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক ওয়েটিং লাউঞ্জ রয়েছে, যেখানে আরামদায়ক সোফা ও চার্জিং সকেট বিদ্যমান।
- সাধারণ পুরুষ ও মহিলা বিশ্রামাগার: নন-এসি শোভন ও শোভন চেয়ারের যাত্রীদের জন্য আলাদা বিশাল পরিচ্ছন্ন ওয়েটিং হলরুম রয়েছে।
- মা ও শিশু ফিডিং কর্নার: স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্য নিরাপদ ও পর্দানশীন বিশেষ ব্রেস্টফিডিং কর্নার স্থাপন করা হয়েছে।
- নামাজের স্থান ও ওজুখানা: স্টেশনের ভেতরেই পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আলাদা পরিচ্ছন্ন নামাজের সুব্যবস্থা রয়েছে।
লাগেজ ক্লকরুম ও পার্সেল বুকিং সুবিধা
আপনি যদি ঢাকায় কয়েক ঘণ্টার জন্য ট্রানজিটে থাকেন এবং লাগেজ রেখে শহর ঘুরতে চান, তবে কমলাপুর স্টেশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফর্ম সংলগ্ন অফিসিয়াল লাগেজ ক্লকরুম (Cloak Room) ব্যবহার করতে পারেন। প্রতিটি লাগেজের জন্য নির্দিষ্ট সরকারি ফি প্রদান করে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত নিরাপদে ব্যাগ জমা রাখা যায়। জমা দেওয়ার সময় যাত্রীর এনআইডি কপি ও ট্রেনের বৈধ টিকিট প্রদর্শন করতে হয়। এছাড়া মোটরসাইকেল, ভারী মালামাল ও কার্গো প্রেরণের জন্য স্টেশনের পশ্চিম প্রান্তে প্রধান পার্সেল শাখা সার্বক্ষণিক সেবা দিয়ে থাকে।
গাড়ি, মোটরসাইকেল ও মাইক্রোবাস পার্কিং ফি তালিকা
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের মূল ভবনের সামনে সুবিশাল আধুনিক পে-পার্কিং জোন রয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের নির্ধারিত পার্কিং ফি কাঠামো নিচে দেওয়া হলো:
| যানবাহনের ধরন | প্রথম ২ ঘণ্টার ফি | পরবর্তী প্রতি ঘণ্টা | ২৪ ঘণ্টার পূর্ণাঙ্গ চার্জ |
|---|---|---|---|
| মোটরসাইকেল / স্কুটার | ২০ টাকা | ১০ টাকা | ১০০ টাকা |
| প্রাইভেট কার / সিডান কার | ৫০ টাকা | ২০ টাকা | ৩০০ টাকা |
| মাইক্রোবাস / হাইয়েস | ৮০ টাকা | ৩০ টাকা | ৪৫০ টাকা |
| সিএনজি অটোরিকশা | ২০ টাকা | ১০ টাকা | ১৫০ টাকা |
যোগাযোগ ও পরিবহন কানেক্টিভিটি (মেট্রোরেল ও বাস)
কমলাপুর স্টেশন থেকে ঢাকার যেকোনো প্রান্তে যাতায়াত অত্যন্ত সহজ ও বহুমুখী:
- ঢাকা মেট্রোরেল (MRT Line 6): মতিঝিল থেকে কমলাপুর বর্ধিতাংশ চালু হওয়ায় এখন ট্রেনযাত্রীরা সরাসরি স্টেশন এলাকা থেকেই মেট্রোরেলে চড়ে সচিবালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ফার্মগেট, মিরপুর ও উত্তরা অত্যন্ত দ্রুত ও যানজটহীনভাবে পৌঁছাতে পারেন।
- সিটি বাস ও বিআরটিসি সার্ভিস: স্টেশনের বাইরে মতিঝিল ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল সংলগ্ন হওয়ায় গাজীপুর, সাভার, আবদুল্লাহপুর ও নারায়ণগঞ্জগামী সকল রুটের বাস সহজেই পাওয়া যায়।
- রাইডশেয়ারিং ও সিএনজি ড্রপ জোন: স্টেশনের ড্রপ-অফ পয়েন্টে উবার, পাঠাও ও সিএনজি অটোরিকশার জন্য সুনির্দিষ্ট পিকআপ ও ড্রপ লেন নির্ধারিত রয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে ও স্টেশন আপডেটে যুক্ত থাকুন
দেশের সকল রেলওয়ে স্টেশনের সুযোগ-সুবিধা, জরুরি নম্বর ও ট্রেনের আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হন।
হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যোগ দিনজরুরি হেল্পলাইন ও স্টেশন মাস্টার যোগাযোগ ডিরেক্টরি
- কমলাপুর স্টেশন মাস্টার কন্ট্রোল রুম: ০২-৯৩৫৮৬৩৪
- রেলওয়ে তথ্য ও অনুসন্ধান ডেস্ক: ০২-৯৩৫৮৬৩৭
- রেলওয়ে জিআরপি থানা (ঢাকা স্টেশন): ০১৭১৩-৩৭৩২৮১
- রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি): ০১৭৩০-০৮৮৮২৩
- জাতীয় জরুরি সেবা হেল্পলাইন: ৯৯৯ (যেকোনো দুর্ঘটনা বা আইনগত সহায়তায়)
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের অফিসিয়াল নাম কী?
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের অফিসিয়াল নাম হলো ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন এবং এর আন্তর্জাতিক রেলওয়ে কোড হলো DA।
কমলাপুর স্টেশনে কি লাগেজ জমা রাখার ক্লকরুম আছে?
হ্যাঁ, ১ নম্বর প্ল্যাটফর্ম সংলগ্ন লাগেজ ক্লকরুমে নামমাত্র সরকারি ফি প্রদান করে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত যাত্রীদের লাগেজ নিরাপদে জমা রাখা যায়।
কমলাপুর স্টেশনের মোট প্ল্যাটফর্ম সংখ্যা কতটি?
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে যাত্রীদের ওঠানামার জন্য মোট ৮টি সুপ্রশস্ত সক্রিয় প্ল্যাটফর্ম রয়েছে।
বিনা টিকিটে কি কমলাপুর স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করা যায়?
না, স্মার্ট ব্যারিয়ার গেট ও এনআইডি কিউআর কোড স্ক্যানিং ব্যবস্থার কারণে বৈধ টিকিট ছাড়া কোনো যাত্রীর প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
কমলাপুর স্টেশনে কি কার পার্কিং সুবিধা আছে?
হ্যাঁ, স্টেশনের মূল ভবনের সামনে মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসের জন্য বিশাল আধুনিক পে-পার্কিং জোন সার্বক্ষণিক উন্মুক্ত থাকে।
মেট্রোরেল দিয়ে কি কমলাপুর স্টেশনে যাওয়া যায়?
হ্যাঁ, ঢাকা মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-৬ মতিঝিল ও কমলাপুর রুটে সরাসরি সংযুক্ত থাকায় দ্রুততম সময়ে স্টেশনে যাতায়াত করা সম্ভব।

One Comment